দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ সরকারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ করেছে যে, তাদের পরিচালিত কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প প্রকল্পে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং চুক্তি লঙ্ঘনের কারণে তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধান না হলে তারা আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে যাওয়ার পদক্ষেপ নেবে।
এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের বিনিয়োগকৃত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অন্যান্য প্রকল্পে সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো পেমেন্ট, গ্যাস সরবরাহ, এবং অবকাঠামোগত সহায়তা দেওয়া হয়নি। এসব কারণে তাদের প্রকল্পগুলো উৎপাদন ক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
এস আলম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করতে চাই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়ায় আমরা বাধ্য হয়েছি আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠাতে। আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন হলে আমাদের আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।"
তারা দাবি করেছে, সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণে তাদের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস এবং পেমেন্ট না পাওয়ায় মাসিক প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
সরকারে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সরকারের চুক্তি বিষয়ক কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক সালিসি এড়াতে আমরা উদ্যোগ নেব।"
আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত, আইন বিশেষজ্ঞ ড. সাইফুল বারি বলেন, "যদি সরকার চুক্তি লঙ্ঘন করে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে এস আলম গ্রুপ শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। তবে এ ধরনের মামলা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে গিয়ে জয়লাভ করলেও দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এবং এস আলম গ্রুপ দ্রুত আলোচনার টেবিলে বসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হলে দেশের শিল্পখাত এবং বিনিয়োগ পরিবেশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এস আলম গ্রুপের নোটিশ সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতার ঘাটতির বড় উদাহরণ। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের মাধ্যমে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশ সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। এর মধ্যে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম একাই এক হাজার কোটি ডলার দেশের বাইরে পাচার করে নিয়ে গেছেন। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ব্যাংক ডাকাতির এটাই সবচেয়ে বড় ঘটনা।
আহসান মনসুর আরও বলেছিলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি পাচার করেছে। ওই সাক্ষাৎকারের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে দাবি করেন এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মো. সাইফুল আলম। বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলম গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে ‘ভীতি প্রদর্শনমূলক ব্যবস্থা’ নিচ্ছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির আলোকে তার সুরক্ষা প্রাপ্য।
এবার সুস্পষ্টভাবে বলা হলো, ছয় মাসের মধ্যে বিষয়টির সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক সালিসিতে যাবেন সাইফুল আলম।
0 মন্তব্যসমূহ